নাটোর প্রতিনিধিঃ দেশের একমাত্র ঔষধি পল্লী হিসেবে পরিচিত নাটোরের লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া জেলার এক অনন্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এই পল্লীতে আসছেন এবং মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। নাটোর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামজুড়ে এই ভেষজ পল্লীর অবস্থান। ছবির মতো সুন্দর এই পল্লীতে বছরে শুধু অ্যালোভেরাই উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টন। এছাড়া শিমুল মূল, অশ্বগন্ধাসহ ১৪০ ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদন হয়, যার মোট বাজার মূল্য অন্তত শত কোটি টাকা।
চারপাশে মাঠের পর মাঠ সবুজ অ্যালোভেরা। তার পাশের জমিতে চাষ হচ্ছে শতমূল, ঘৃতকাঞ্চন, মিছরিদানা, আলকুশি, অশ্বগন্ধা ও রোজেলা। প্রতিটি বাড়ির উঠানের আঙিনায় রয়েছে নানা প্রজাতির ঔষুধি উদ্ভিদ। এসব উদ্ভিদ উৎপাদন করে দেশের একমাত্র ঔষুধি পল্লী হিসেবে ঐতিহ্য অর্জন করেছে নাটোরের লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের মানুষরা।
সবার কাছে ‘ঔষুধি গ্রাম’ নামে সুপরিচিত এ পল্লী। এখানকার ১৬ গ্রামে চাষ হয় ১৫০ পদের ভেষজ ঔষুধি উদ্ভিদ। আর এসব ভেষজ উদ্ভিদ বাজারজাতকরণে এখানে গড়ে উঠেছে শতাধিক ভেষজ দোকান। ভেষজ উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে এখানকার যুবকরা বেকারত্বকে দূরে সরিয়ে ভেষজ বিপ্লব ঘটিয়ে বদলেছেন নিজেদের ভাগ্য। এ বিপ্লবের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বছরে এসেছে শত কোটি টাকা। ভেষজ উৎপাদন, বাজারজাত, পরিবহন কাজে এলাকার ১০ হাজার মানুষ সম্পৃক্ত রয়েছে।
নাটোর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই এলাকায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয় ভেষজ উদ্ভিদের। যার মধ্যে ৭৫ হেক্টর জমিতেই শুধুমাত্র চাষ হয় অ্যালোভেরা। প্রতি বছরে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিকটন অ্যালোভেরা উৎপাদন হয় এখানে। শিমুলমূল চাষ হয় ৫০ হেক্টর জমিতে। বাকি ৩০ হেক্টর জমিতে করা হয় বিভিন্ন ভেষজ ঔষুধ। এখানকার অ্যালোভেরা প্রতিদিন ট্রাকযোগে চলে যায় দেশের বিভিন্ন জেলাতে। ঔষুধ, প্রসাধন, জুস ও শরবত তৈরিতে প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এ অ্যালোভেরা। ময়মনসিংহের ভালুকাতে জুস তৈরির একটি কারখানা অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা। এসব প্রতিষ্ঠানে পল্লীর ভেষজ গাছ থেকে উৎপাদিত ঔষুধ ও প্রসাধনী রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। বছরে ১০০ কোটি টাকার ভেষজ ঔষুধ বিক্রি হয় এই পল্লী থেকে।
এই ঔষুধি গ্রামের মূল নায়ক কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলা। ১৯৯৫ সালের দিকে খোলাবাড়িয়া নিজ বসতবাড়িতে শুরু করেন ভেষজ ঔষুধ চাষ। নিজের বসতবাড়ির আশপাশে রোপণ করেন নানা জাতের ভেষজ। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করতেন তিনি। তার হাত ধরেই গ্রামের পর গ্রাম ছড়িয়েছে এ ভেষজ চাষ। তার কাছ থেকে এলাকার মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়ে ভেষজ উৎপাদন শুরু করেন।
এখন দুই ইউনিয়নের ১৬ গ্রামে চাষ হয় এসব ভেষজ। ওই এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসলে রুপ নিয়েছে এটি। এক সময়ে অভাব ও দারিদ্র্যে থাকা পল্লীর পরিবারে ফিরেছে সচ্ছলতা। ভেষজ চাষে পাল্টে গেছে পুরো এলাকার চিত্র। ইব্রাহিমপুর, নতুনবাজার, হাজীগঞ্জ, আমিরগঞ্জ, গাবতলী, লক্ষীপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে-ঘৃতকাঞ্চন, শতমূলী, শিমুল, মিসরি দানা, ভুঁইকুমড়া, আলকুচি, বাসক, তুলসী, হরিতকী, বহেরা, তেলাকুচ, কেশরাজ, ধুতরা, পুদিনা, যষ্টিমধু, নিম, অর্জুন, ওলটকম্বল, লজ্জাবতী, হস্তী পলাশ, নিশিন্দা, রাজকণ্ঠ, নীলকণ্ঠ, হিমসাগর, দুধরাজ, ঈশ্বর মূল, রাহু চান্দাল, রক্ত চান্দাল, ভাই চান্দাল, বোন চান্দাল, ভুঁইকুমড়া, আমরুল, কেয়ামূলসহ শত রকমের ঔষধি গাছ। সেই আফাজ উদ্দিন পাগলার ছোট প্রচেষ্টা আজ দেশের একমাত্র ভেষজ পল্লী হিসেবে গড়ে উঠেছে। আফাজ উদ্দিনের মৃত্যু হলেও তার দেখানো পথ অনুসরণে পুরো এলাকায় মানুষের ভাগ্য পাল্টেছে।
রোজেলা চাষি শহিদুল ইসলাম জানান, ২০১৭ সালে প্রথম আমি রোজেলা চাষ শুরু করি। এ বছর ২ একর জমি চাষ করেছি। আমার এ চাষ দেখে স্থানীয় অনেক কৃষক উদ্বুদ্ধ হয়ে চাষ করেছেন।
হাফিজুল ইসলাম নামে আরেক চাষি জানান, ১০ বছর থেকে অ্যালোভেরা চাষ করছি। অ্যালোভেরা চাষ অনেক লাভজনক। সঠিক পরিচর্যা করলে অ্যালোভেরার ফলন ভালো হয়। বছরে ১ বিঘা জমি থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে। আমাদের পুরো এলাকায় কম বেশি অ্যালোভেরা চাষ হয়। অনেক ব্যবসায়ী জমি থেকে অ্যালোভেরা কিনে নিয়ে ঢাকায় বিক্রি করেন।
ভেষজ চাষি রুস্তম আলী জানান, সর্বপ্রথম আমাদের এলাকায় ভেষজ ঔষুধ চাষ শুরু করেন আফাজ উদ্দিন। তার মাধ্যমে সবাই এ চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। পুরো এলাকার মানুষ এ পেশায় যুক্ত। অনেক কৃষক এ ভেষজ চাষ করে হয়েছেন স্বাবলম্বী, অনেক পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে। এই এলাকায় অ্যালোভেরা চাষ বেশি হয়ে থাকে। অ্যালোভেরা চাহিদা অনেক। পাশাপাশি দিনে দিনে রোজেলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক কৃষক।
লক্ষ্মীপুর বাজারের ভেষজ পণ্য ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন জানান, আমাদের নিজস্ব উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে পাউডার ও হালুয়া তৈরি করি। এসব ভেষজ পণ্য শরীরের দুর্বলতা, পেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগ নিরাময় করে। প্রাকৃতিক উপায়ে এসব ভেষজ পাউডার সারাদেশে বিক্রি করি। চাহিদা অনেক, ফলে প্রতিদিন ব্যবসায়ীরা কিনতে আসেন। আমার মতো এলাকার অসংখ্য মানুষ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাবিবুল ইসলাম বলেন, ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করে ১৫/১৬ গ্রামের ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার চাষকৃত ঔষুধ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। বিশেষ করে অ্যালোভেরা প্রচুর উৎপাদন হয়ে থাকে। এটা কাঁচামাল হিসেবে শরবতের খুব জনপ্রিয়। ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা ও কৃষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হলে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ রবিন মিয়া
নির্বাহী সম্পাদকঃ ইরিন তৃষ্ণা
ফোন নাম্বারঃ 01937643838
ফোন নাম্বারঃ 01772666086
Email: News@doinikalokbarta.online
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: সেকশন-৬, ব্লক-ক লেইন-১, বাড়ি - ২০/১ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2025 All rights reserved দৈনিক আলোক বার্তা