বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কুরিয়ার ইউনিটে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে কাস্টমসের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে।

সম্প্রতি একটি আমদানি চালানকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত পণ্যের তথ্য গোপন করে কাগজপত্রে অন্য পণ্যের ঘোষণা দিয়ে চালানটি আমদানি করা হয়। অথচ সেই চালানের বিপরীতে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা শুল্ক-কর নির্ধারণ করে পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। পরে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষের তদন্তে বেরিয়ে আসে, চালানটির বিপরীতে সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত শুল্ক-কর এবং প্রকৃত প্রাপ্য রাজস্বের মধ্যে বিশাল ব্যবধান ছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট ফুলএভার বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে একটি পণ্য চালান আমদানি করে। চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৯৯২৬২৩। আমদানির কাগজপত্রে পণ্য হিসেবে কাগজের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে আরএফ লেভেলের পণ্য পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, কুরিয়ার ইউনিটের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতেই চালানটির শুল্কায়ন করে ছাড়ের ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে চালানটির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হয়। তদন্তে ঘোষণার সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের পার্থক্য পাওয়া যায়। এরপর ফুলএভার বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে মামলা করে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। তবে পণ্য খালাসের পর এই অনিয়ম ধরা পড়ায় এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফুলএভার বিডির পরবর্তী চালানগুলো নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি কুরিয়ার ইউনিটের আরও ৩১টি চালানে লক দিয়েছে প্রিভেন্টিভ টিম। একই সঙ্গে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

কুরিয়ার ইউনিটের মাধ্যমে সাধারণত নমুনা পণ্য আমদানির সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এলসি ছাড়া আমদানি করা নমুনা পণ্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই প্রক্রিয়ায় খালাস করা যায়। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ হাজার ডলারের পণ্য এভাবে আনতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই নিয়মের সুযোগ নিয়ে কুরিয়ার ইউনিটকে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করা পণ্য সাধারণত ফ্রেইটের মাধ্যমে আনার কথা।

কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, সাকিব আনাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর কুরিয়ার ইউনিটে বাণিজ্যিক পণ্য খালাসের প্রবণতা বেড়েছে। কোনো কোনো সময়ে ফ্রেইটের তুলনায় কুরিয়ার ইউনিটে বেশি বিল অব এন্ট্রি জমা পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বের করে নিচ্ছে। এর পেছনে আর্থিক সুবিধা আদান-প্রদান এবং একটি অসাধু চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি উঠেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার রইচ উদ্দিন খান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ফুলএভার বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য খালাস করেছিল। পরে তদন্তে দেখা যায়, ঘোষণায় উল্লেখ করা পণ্যের পরিবর্তে আরএফ লেভেলের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং তাদের পরবর্তী চালানগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

তবে শুধু ফুলএভার বিডির চালান নয়, কুরিয়ার ইউনিটে আরও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একজন শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রির পণ্য খালাস করা হয়েছে। এসব পণ্য ডেল্টা কার্গো মিডিয়ার নামে ছাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাস্টম হাউসের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে, একজন শ্রমিকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এত অল্প সময়ে কীভাবে বিপুলসংখ্যক চালান খালাসের সুযোগ তৈরি হলো এবং এসব চালানের শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্ব পালন করেছেন।

অভিযোগের তালিকায় থাকা বিল অব এন্ট্রিগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০৯৯৬৯৫, ১০৯৯৭৫৬, ১০৯৯৭৪৫, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭০২, ১০৮৮৭১২, ১০৮৪৬৪২, ১০৮৪৫৪৮, ১০৮৩৩৪৫, ১০৮৩৩৩৯, ১০৭৯৬৯২, ১০৮০৯৩৭, ১০৭৮৭১৮, ১০৮০৯৮২ এবং ১০৭৯৪৭৮। এসব চালান কীভাবে খালাস হয়েছে, আমদানিকারক হিসেবে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত ছিলেন এবং শুল্কায়নের সময় কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব চালান ছাড়ের ক্ষেত্রে সাকিব আনাম খানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, কুরিয়ার ইউনিটকে ঘিরে দুটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার বা ভাড়া নিয়ে পণ্য খালাসের কাজ করছে। বন্ডেড ফেব্রিক্স থেকে শুরু করে সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের পণ্য কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে কম শুল্কে খালাস নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এর আগেও কুরিয়ার ইউনিটে অন্য ব্যক্তির পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পণ্য আমদানির ঘটনা ঘটেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের পরিচয় ব্যবহার করে নকল সিগারেটের ব্যান্ডরোল আমদানির অভিযোগ সামনে এসেছিল। চালানটি আটক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে তাঁর নামে শুল্ক ফাঁকির মামলা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ওই ব্যক্তি আসলে পণ্যটি আমদানি করেননি। অন্য কেউ তাঁর পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চালানটি এনেছিল। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজের পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম করার অভিযোগে থানায় মামলাও করেন। ফলে কুরিয়ার ইউনিটে পরিচয়পত্রের অপব্যবহার এবং আমদানিকারকের প্রকৃত পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু কুরিয়ার ইউনিটের দায়িত্ব পালনের সময়কার নয়। এর আগে অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপে কর্মরত থাকাকালেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আর্থিক সুবিধা না পেলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হতো। এতে ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে পড়তেন এবং আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত থাকার সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই সময় তাঁকে ঈশ্বরদী ইপিজেডে পদায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তৎকালীন রাজশাহী ভ্যাট কমিশনার তাঁকে মাত্র দুই মাসের মাথায় ওই পদ থেকে সরিয়ে দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সর্বশেষ ঢাকা কাস্টম হাউসে কুরিয়ার ইউনিটের অনিয়ম নিয়ে আলোচনা ও তদন্তের মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার সাকিব আনাম খানকে অন্য একটি শাখায় বদলি করা হয়েছে। তবে শুধু বদলি করেই এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফুলএভার বিডির চালানে কীভাবে ৭৬ লাখ টাকার রাজস্বের বিপরীতে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলো, ডেল্টা কার্গো মিডিয়ার নামে শ্রমিকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এতগুলো চালান কীভাবে ছাড় হলো এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ফুলএভার বিডিসহ কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ নাকচ করেন। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে ঘোষণা দিয়েছিল। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির মামলা হয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা শুল্ক-কর প্রযোজ্য হওয়ার পরও কীভাবে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে চালানটি ছাড় করা হয়েছিল, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

সব মিলিয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিটে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া, শুল্কায়নে স্বচ্ছতা, পরিচয়পত্রের অপব্যবহার এবং কথিত সিন্ডিকেটের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে রাজস্ব ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং সরকারি অর্থ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *