
শরীয়তপুর প্রতিনিধিঃ শরীয়তপুর ও চাঁদপুর জেলার সীমান্তবর্তী মেঘনা নদী এলাকায় সরকারি খাসজমিতে নির্মিত মৎস্যঘের উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে টানা তিন দিন অভিযান চালিয়ে কয়েকটি মৎস্যঘেরের বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। এতে ঘেরের মাছ নদীতে চলে যাওয়ায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন মৎস্যচাষি ও ঘের মালিকেরা।
শরীয়তপুরের ফেরিঘাট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় এসব মৎস্যঘের গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র সরকারি খাসজমিতে ঘের নির্মাণ করে পরে সাধারণ ব্যবসায়ী ও মৎস্যচাষিদের কাছে সেগুলো লিজ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মমিন দিদার নামের এক ব্যক্তি এসব ঘের নির্মাণ ও পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী স্থানীয় নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ঘেরের বাঁধ কেটে দেওয়ার পর মাছ নদীতে ছড়িয়ে পড়লে চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ সেখানে মাছ ধরতে আসেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘের মালিকদের দাবি, অনেকে এসব মাছ কম দামে বিক্রি করেছেন। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা বলে দাবি করেছেন। তবে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের দাবি, সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করার লক্ষ্যেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মৎস্যঘেরের বাঁধের বিভিন্ন অংশ কেটে দিয়ে মেঘনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি খাসজমি অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘের মালিক ও মৎস্যচাষিদের অভিযোগ, কোনো ধরনের আগাম নোটিশ না দিয়েই তাদের ঘেরের বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। এতে চাষ করা বিপুল পরিমাণ মাছ নদীতে চলে যায়। তাদের দাবি, আগে থেকে নোটিশ দিয়ে সময় দেওয়া হলে মাছ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো এবং ক্ষয়-ক্ষতি অনেকটাই কমানো যেতো।
একজন ঘের মালিক অভিযোগ করে বলেন, ‘শুধু আমাদের ঘেরের বাঁধ কাটা হয়নি, মাছের জন্য আনা খাবারও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আমরা আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছি। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি করছি।’
ঘের মালিকরা আরও বলেন, শরীয়তপুর ও চাঁদপুরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কাগজপত্র নিয়ে তারা সেখানে মৎস্য চাষ করছিলেন। জমির কোনো অংশ সরকারি খাসজমি হলে প্রশাসন তাদের নোটিশ দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু আগাম নোটিশ ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তাদের দাবি, মৎস্যঘেরগুলোর কিছু অংশ চাঁদপুর এবং কিছু অংশ শরীয়তপুর জেলার সীমানার মধ্যে পড়েছে। দুই জেলার সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে তারা প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় দ্রুত সীমানা নির্ধারণ, ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, ক্ষতিপূরণ এবং আইনসম্মতভাবে মৎস্য চাষের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রথমে দুই জেলার সীমানা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ঘেরের কোন অংশ চাঁদপুর এবং কোন অংশ শরীয়তপুরের সীমানার মধ্যে পড়েছে, তা নির্ধারণের পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। শরীয়তপুরের সীমানায় থাকা অংশে বিধি মেনে মৎস্য চাষের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, ঘের কেটে দেওয়ার ঘটনায় কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও দাবি করেছেন ঘের মালিকেরা। তাদের আহ্বান, দুই জেলার প্রশাসন যৌথভাবে সীমানা জটিলতার সমাধান করে ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিক।
